স্যামসন এইচ চৌধুরী স্কয়ার গ্রুপের স্বপ্নদ্রষ্টার গল্প

স্যামসন এইচ চৌধুরী স্কয়ার গ্রুপের স্বপ্নদ্রষ্টার গল্প

Table of Contents

ভূমিকা:

                  কেন স্যামসন এইচ চৌধুরী বাংলাদেশের শিল্পজগতে এক অবিস্মরণীয় নাম?

বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডে যখন শিল্পায়নের ধারণাটি ছিল অনেকটাই নতুন এবং সীমাবদ্ধ, তখন কিছু মানুষ স্বপ্ন দেখেছিলেন নিজেদের উদ্যোগে দেশের ভাগ্য পরিবর্তনের। তাঁরা শুধু ব্যবসায়ী ছিলেন না, ছিলেন একেকজন স্বপ্নদ্রষ্টা। আর সেই স্বপ্নদ্রষ্টাদের কাতারে স্যামসন এইচ চৌধুরী ছিলেন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি এমন একজন মানুষ, যাঁর হাত ধরে গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের অন্যতম সফল এবং বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী ‘স্কয়ার গ্রুপ’। তাঁর গল্প শুধু একজন সফল উদ্যোক্তার গল্প নয়, এটি সততা, কঠোর পরিশ্রম, দূরদর্শিতা এবং মানবিকতার এক অনন্য উপাখ্যান।

স্যামসন এইচ চৌধুরীর জীবন ছিল সাধারণের মধ্য থেকে অসাধারণ হয়ে ওঠার এক জীবন্ত উদাহরণ। তিনি প্রমাণ করেছেন যে সততা এবং নৈতিকতাকে সঙ্গী করে যেকোনো প্রতিকূলতাকে জয় করা সম্ভব। স্কয়ার গ্রুপ প্রতিষ্ঠার পেছনে তাঁর মূল দর্শন ছিল কেবল মুনাফা অর্জন নয়, বরং দেশের মানুষের জন্য মানসম্মত পণ্য ও সেবা নিশ্চিত করা এবং হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি করা। যে প্রতিষ্ঠানটি মাত্র চারজন বন্ধুর ২০,০০০ টাকার পুঁজি দিয়ে শুরু হয়েছিল, সেটিই আজ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক বিশ্বস্ত নাম। স্বাস্থ্যসেবা থেকে শুরু করে ভোগ্যপণ্য, বস্ত্র, মিডিয়া—এমন কোনো ক্ষেত্র নেই যেখানে স্কয়ার তার সাফল্যের ছাপ রাখেনি। আর এই বিশাল অর্জনের পেছনে যাঁর নামটি স্বর্ণাক্ষরে লেখা, তিনি স্যামসন এইচ চৌধুরী। আজকের আধুনিক বাংলাদেশের অর্থনীতি ও শিল্পজগতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য এবং তিনি হয়ে উঠেছেন প্রজন্মের পর প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের জন্য এক অফুরন্ত অনুপ্রেরণার উৎস।

স্যামসন এইচ চৌধুরীর প্রারম্ভিক জীবন ও স্বপ্নের সূচনা

প্রতিটি সফল মানুষের পেছনে থাকে संघर्ष ও প্রস্তুতির এক দীর্ঘ গল্প। স্যামসন এইচ চৌধুরীর জীবনও তার ব্যতিক্রম ছিল না। তাঁর শৈশব, কৈশোর এবং কর্মজীবনের প্রথম দিকের অভিজ্ঞতাগুলোই তাঁকে ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করেছিল। তাঁর ভেতরের উদ্যোক্তা সত্তাটি একদিনে তৈরি হয়নি; বরং এটি ছিল তাঁর বেড়ে ওঠা, শিক্ষা এবং পারিপার্শ্বিকতার এক সম্মিলিত ফলাফল।

জন্ম ও পারিবারিক প্রেক্ষাপট

স্যামসন এইচ চৌধুরীর জন্ম ১৯২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর, তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ফরিদপুর জেলার অন্তর্গত আতাইকুলা গ্রামে (বর্তমানে পাবনা জেলার অংশ)। তাঁর বাবা ছিলেন ডা. ইয়াকুব হোসেন চৌধুরী এবং মা লতিকা চৌধুরী। তাঁর বাবা একজন সম্মানিত মেডিকেল অফিসার হওয়ায় পরিবারে শিক্ষা ও শৃঙ্খলার একটি সুন্দর পরিবেশ ছিল। ছোটবেলা থেকেই তিনি তাঁর বাবার কাছ থেকে মানুষের সেবা করার এবং সততার সঙ্গে জীবনযাপন করার শিক্ষা পেয়েছিলেন।

তাঁর পারিবারিক মূল্যবোধ ছিল অত্যন্ত দৃঢ়। বাবা-মায়ের কাছ থেকে পাওয়া শৃঙ্খলা, কঠোর পরিশ্রমের মানসিকতা এবং মানুষের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ তাঁর চরিত্র গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শৈশবের সেই দিনগুলোতেই তাঁর মধ্যে একটি স্বাধীনচেতা মনোভাব এবং নতুন কিছু করার অদম্য ইচ্ছা জন্মায়, যা তাঁকে পরবর্তী জীবনে একজন সফল উদ্যোক্তা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেতে সাহায্য করেছিল।

শিক্ষাজীবন ও কর্মজীবনের প্রথম ধাপ

শিক্ষাজীবনের একটি বড় অংশ তিনি কাটান ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। কলকাতার বিষ্ণুপুর হাই স্কুল থেকে তিনি ম্যাট্রিকুলেশন সম্পন্ন করেন। এরপর তিনি হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের একটি সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামসহ আরও বেশ কিছু প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন, যা তাঁর ব্যবসায়িক জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করে।

তবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়েছিল বেশ ভিন্নভাবে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ব্রিটিশ রয়্যাল ইন্ডিয়ান নেভিতে যোগ দেন। সেখান থেকে ফিরে এসে তিনি কিছুদিন ডাক বিভাগে চাকরি করেন। কিন্তু কোনো গতানুগতিক কাজেই তিনি পুরোপুরি মন বসাতে পারছিলেন না। তাঁর ভেতর সবসময় নিজের মতো করে কিছু একটা করার তাগিদ কাজ করত। এই তাগিদ থেকেই তিনি তাঁর বাবার মতো ওষুধ ব্যবসার দিকে ঝুঁকে পড়েন। পাবনায় ‘হোসেন ফার্মেসি’ নামে একটি ছোট ওষুধের দোকান দিয়ে তিনি ব্যবসায়িক জগতে প্রথম পা রাখেন। এই ছোট ফার্মেসিই ছিল তাঁর ভবিষ্যৎ বিশাল শিল্প সাম্রাজ্যের সূতিকাগার। এখানে কাজ করার সময়ই তিনি দেশের ওষুধ শিল্পের সংকট ও সম্ভাবনাগুলো উপলব্ধি করতে পারেন এবং একটি নিজস্ব ওষুধ কোম্পানি গড়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন।

স্কয়ার গ্রুপের জন্ম: চার বন্ধুর হাত ধরে এক বিপ্লবের সূচনা

প্রত্যেক বড় বিপ্লবের পেছনে থাকে একটি শক্তিশালী স্বপ্ন এবং সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার জন্য কিছু দৃঢ়প্রত্যয়ী মানুষ। স্কয়ার গ্রুপের জন্মকথাও ঠিক তেমনই এক গল্প। এটি চারজন বন্ধুর সম্মিলিত স্বপ্ন, সততা আর পরিশ্রমের ফসল, যা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের শিল্পজগতে এক নীরব বিপ্লব নিয়ে আসে।

১৯৫৮ সাল: একটি স্বপ্নের যাত্রা শুরু

সময়টা ১৯৫৮ সাল। স্যামসন এইচ চৌধুরী এবং তাঁর তিন বন্ধু—ডা. কাজী হারুন-উর-রশিদ, ডা. পি. কে. সাহা এবং রাধাবিন্দ রায়—একসাথে হলেন একটি বড় স্বপ্ন নিয়ে। স্বপ্নটি ছিল দেশে মানসম্মত ওষুধ তৈরি করা, যা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকবে। সেই সময়ে দেশের ওষুধের বাজার ছিল মূলত বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর দখলে এবং মানসম্মত ওষুধের জন্য মানুষকে চড়া মূল্য দিতে হতো।

এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের লক্ষ্যে তাঁরা চারজন মিলে মাত্র ২০,০০০ টাকা পুঁজি নিয়ে পাবনায় স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস নামে একটি ছোট পার্টনারশিপ ফার্ম প্রতিষ্ঠা করেন। ‘স্কয়ার’ নামটি নির্বাচন করা হয়েছিল কারণ এর চারটি বাহু সমান, যা তাঁদের চার বন্ধুর সমান অংশীদারত্ব, সততা, স্বচ্ছতা এবং গুণগত মানের প্রতীক। একটি ভাড়া করা বাড়িতে মাত্র ১২ জন কর্মী নিয়ে শুরু হয়েছিল সেই স্বপ্নের যাত্রা। তাঁদের লক্ষ্য ছিল একটাই—গুণগত মানের সঙ্গে কোনো আপস না করে দেশের মানুষের জন্য ওষুধ তৈরি করা।

প্রাথমিক চ্যালেঞ্জ ও প্রতিকূলতা

শুরুর পথটা মোটেও মসৃণ ছিল না। একদিকে ছিল বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতা, অন্যদিকে ছিল পুঁজির স্বল্পতা এবং প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা। নতুন একটি দেশীয় কোম্পানি হিসেবে মানুষের আস্থা অর্জন করা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু স্যামসন এইচ চৌধুরী এবং তাঁর সহযোগীরা হাল ছাড়েননি।

তাঁরা জানতেন, এই বাজারে টিকে থাকতে হলে পণ্যের গুণগত মানই হবে তাঁদের প্রধান শক্তি। স্যামসন এইচ চৌধুরী নিজে প্রতিটি ধাপে কঠোরভাবে মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি তদারকি করতেন। তিনি বিশ্বাস করতেন, একবার যদি মানুষের আস্থা অর্জন করা যায়, তবে সাফল্য আসবেই। ধীরে ধীরে স্কয়ারের ওষুধের গুণগত মানের কথা মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। চিকিৎসক এবং রোগীরা স্কয়ারের ওপর আস্থা রাখতে শুরু করেন। চার বন্ধুর সততা, নিষ্ঠা এবং কঠোর পরিশ্রমের ফলে স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস ধীরে ধীরে প্রতিকূলতাকে জয় করে সাফল্যের পথে এগিয়ে যেতে থাকে, যা ছিল এক নতুন ইতিহাসের সূচনা।

স্কয়ার গ্রুপের विस्तार: শুধু ওষুধ শিল্পেই সীমাবদ্ধ নয়

স্যামসন এইচ চৌধুরীর দূরদর্শিতা তাঁকে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখেনি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, একটি দেশের সত্যিকারের উন্নয়নের জন্য বহুমুখী শিল্পায়ন প্রয়োজন। ওষুধ শিল্পে সফল হওয়ার পর তিনি দেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অন্যান্য চাহিদা পূরণের দিকে মনোযোগ দেন। তাঁর নেতৃত্বে স্কয়ার গ্রুপ ফার্মাসিউটিক্যালসের গণ্ডি পেরিয়ে হয়ে ওঠে এক বৈচিত্র্যময় শিল্পগোষ্ঠী।

স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেড: ঘরে ঘরে পরিচিত এক নাম

১৯৮৮ সালে স্কয়ার টয়লেট্রিজ লিমিটেড প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভোগ্যপণ্য (FMCG) জগতে প্রবেশ করে স্কয়ার। মেরিল, সেনোরা, চাকা, জুঁই-এর মতো ব্র্যান্ডগুলো খুব অল্প সময়েই বাংলাদেশের মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে যায়। এর পেছনের কারণ ছিল দুটি—আন্তর্জাতিক মানের পণ্য এবং সাশ্রয়ী মূল্য। স্যামসন এইচ চৌধুরী বিশ্বাস করতেন, প্রসাধন ও ব্যক্তিগত পরিচর্যার পণ্য শুধু উচ্চবিত্তের জন্য নয়, বরং সাধারণ মানুষেরও অধিকার। তিনি বিদেশি পণ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশেই বিশ্বমানের পণ্য উৎপাদনের উদ্যোগ নেন, যা দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি মানুষের জীবনযাত্রার মানও উন্নত করে।

স্কয়ার টেক্সটাইলস ও অন্যান্য শিল্প

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পোশাক ও বস্ত্রশিল্পের গুরুত্ব উপলব্ধি করে স্যামসন এইচ চৌধুরী এই খাতেও বিনিয়োগ করেন। ১৯৯৭ সালে যাত্রা শুরু করে স্কয়ার টেক্সটাইলস ডিভিশন, যা পরবর্তীতে দেশের অন্যতম বৃহৎ এবং আধুনিক বস্ত্রশিল্প প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। সুতা উৎপাদন থেকে শুরু করে ডেনিম, নিট ফেব্রিকস তৈরিতে স্কয়ার এক নতুন মানদণ্ড স্থাপন করে। পাশাপাশি তিনি কৃষি, তথ্যপ্রযুক্তি, ফুড অ্যান্ড বেভারেজের মতো খাতেও বিনিয়োগ করেন। স্কয়ার এগ্রো লিমিটেডের মাধ্যমে তিনি নিরাপদ খাদ্য ও কৃষিপণ্যের প্রসারে কাজ করেছেন, যা দেশের কৃষি অর্থনীতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।

স্কয়ার হসপিটালস: স্বাস্থ্যসেবায় এক নতুন দিগন্ত

স্যামসন এইচ চৌধুরীর জীবনের অন্যতম সেরা কীর্তি বলা হয় স্কয়ার হসপিটালস প্রতিষ্ঠা। তিনি প্রায়ই বলতেন, “যে দেশের মানুষের জন্য ওষুধ বানাই, সে দেশের মানুষের জন্য একটি বিশ্বমানের হাসপাতাল থাকবে না, তা হতে পারে না।” এই চিন্তা থেকেই ২০০৬ সালে ঢাকার প্রাণকেন্দ্রে যাত্রা শুরু করে স্কয়ার হসপিটালস। এটি শুধু একটি হাসপাতাল নয়, এটি ছিল দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতে এক বিপ্লবের নাম। অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, সেরা চিকিৎসক এবং আন্তর্জাতিক মানের সেবা নিশ্চিত করে স্কয়ার হসপিটালস দেশের মানুষের চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা অনেকটাই কমিয়ে আনে। এটি ছিল তাঁর সামাজিক দায়বদ্ধতার এক অসাধারণ উদাহরণ।

মিডিয়া জগতে প্রবেশ: মাছরাঙা টেলিভিশন

ব্যবসায়িক সাফল্যের পাশাপাশি তিনি দেশের শিল্প, সংস্কৃতি ও গণমাধ্যমের বিকাশেও আগ্রহী ছিলেন। ২০১১ সালে স্কয়ার গ্রুপের হাত ধরে যাত্রা শুরু করে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ‘মাছরাঙা’। বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ এবং মানসম্মত অনুষ্ঠান প্রচারের মাধ্যমে চ্যানেলটি অল্প সময়েই জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এর মাধ্যমে তিনি কেবল ব্যবসায়িক জগতেই নয়, দেশের তথ্য প্রবাহ এবং সুস্থ বিনোদনের ক্ষেত্রেও অবদান রাখেন।

স্যামসন এইচ চৌধুরীর ব্যবসায়িক দর্শন ও নীতি

স্কয়ার গ্রুপের আকাশচুম্বী সাফল্যের পেছনে ছিল স্যামসন এইচ চৌধুরীর কিছু মৌলিক ব্যবসায়িক দর্শন ও নীতি। তিনি শুধু মুনাফার পেছনে ছোটেননি, বরং মূল্যবোধকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে গেছেন।

গুণগত মানের प्रति আপসহীন মনোভাব

“Quality is a journey, not a destination” – এই ছিল তাঁর বিশ্বাস। স্কয়ারের প্রতিটি পণ্যের গায়ে “A mark of quality” লেখার পেছনে ছিল তাঁর আপসহীন মনোভাব। তিনি কর্মীদের বলতেন, “এমন কোনো পণ্য তৈরি করবে না, যা তুমি তোমার নিজের পরিবারের জন্য ব্যবহার করতে পারবে না।” এই একটি কথাই স্কয়ারের গুণগত মান নিশ্চিত করার জন্য যথেষ্ট ছিল। তিনি জানতেন, আস্থা তৈরি হয় পণ্যের মানের মাধ্যমে, বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে নয়।কর্মী কল্যাণ: কর্মীদের সন্তুষ্টিই ছিল তাঁর অগ্রাধিকার

স্যামসন এইচ চৌধুরীকে বলা হতো একজন ‘কর্মী-বান্ধব’ উদ্যোক্তা। তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি প্রতিষ্ঠানের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার কর্মীরা। তিনি স্কয়ারকে একটি পরিবারের মতো করে গড়ে তুলেছিলেন। কর্মীদের জন্য বাসস্থান, চিকিৎসা, তাদের সন্তানদের জন্য মানসম্মত শিক্ষার ব্যবস্থা করা—সবকিছুতেই তিনি নজর রাখতেন। পাবনায় স্কয়ারের কারখানার পাশে কর্মীদের জন্য আবাসন প্রকল্প, স্কুল ও হাসপাতাল তৈরি করে তিনি এক অনন্য নজির স্থাপন করেন। তিনি বলতেন, “কর্মীরা সন্তুষ্ট থাকলে প্রতিষ্ঠান এগিয়ে যাবেই।”

সততা ও নৈতিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত

এ যুগে যখন ব্যবসায়িক জগতে নানা অনৈতিক চর্চার অভিযোগ ওঠে, স্যামসন এইচ চৌধুরী ছিলেন সততার এক বাতিঘর। তিনি সময়মতো সরকারি কর প্রদান করাকে দায়িত্ব মনে করতেন এবং দেশের সেরা করদাতা হিসেবে একাধিকবার পুরস্কৃত হয়েছেন। তাঁর ব্যবসায়িক লেনদেন ছিল কাঁচের মতো স্বচ্ছ। তিনি বলতেন, “সততার কোনো বিকল্প নেই, স্বল্পমেয়াদে হয়তো লাভ কম হবে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সততাই তোমাকে টিকিয়ে রাখবে।” তাঁর এই দর্শনই স্কয়ারকে মানুষের কাছে এক বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে স্যামসন এইচ চৌধুরী ও স্কয়ার গ্রুপের অবদান

স্যামসন এইচ চৌধুরী শুধু একজন সফল ব্যবসায়ী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন ‘নেশন বিল্ডার’। দেশের অর্থনীতিতে তাঁর এবং তাঁর প্রতিষ্ঠানের অবদান অপরিসীম।

বিশাল কর্মসংস্থান সৃষ্টি

স্কয়ার গ্রুপ আজ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থানের উৎস। ওষুধ শিল্প থেকে শুরু করে টেক্সটাইল, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি—প্রতিটি খাতে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং তাদের জন্য কাজের সুযোগ সৃষ্টি করে তিনি দেশের বেকারত্ব হ্রাসে অসামান্য ভূমিকা রেখেছেন।

শিল্পায়নের পথপ্রদর্শক

স্যামসন এইচ চৌধুরী ছিলেন বাংলাদেশে শিল্পায়নের অন্যতম পথিকৃৎ। তিনি দেখিয়েছিলেন, সততা ও নিষ্ঠা দিয়ে কীভাবে একটি ছোট উদ্যোগ থেকে বিশাল শিল্পগোষ্ঠী গড়ে তোলা যায়। তাঁর সাফল্য দেশের হাজারো তরুণ উদ্যোক্তাকে অনুপ্রাণিত করেছে। তিনি বিদেশি বিনিয়োগের ওপর নির্ভর না করে দেশীয় শিল্পের বিকাশে জোর দিয়েছিলেন, যা দেশের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্বকে শক্তিশালী করেছে।

স্বীকৃতি ও সম্মাননা

তাঁর কর্মময় জীবনের স্বীকৃতিস্বরূপ স্যামসন এইচ চৌধুরী বহু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। তিনি আমেরিকান চেম্বার অফ কমার্স (AmCham) কর্তৃক “বিজনেস এক্সিকিউটিভ অফ দ্য ইয়ার” এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র কর্তৃক “বিজনেস পার্সোনালিটি অফ দ্য ইয়ার” নির্বাচিত হন। দেশের অর্থনীতিতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক একাধিকবার সেরা করদাতার সম্মাননা লাভ করেন। তবে তিনি বলতেন, “মানুষের ভালোবাসাই আমার সবচেয়ে বড় পুরস্কার।”

উত্তরাধিকার এবং বর্তমান স্কয়ার গ্রুপ

২০১২ সালের ৫ জানুয়ারি স্যামসন এইচ চৌধুরী মৃত্যুবরণ করেন, কিন্তু তাঁর দর্শন ও মূল্যবোধ আজও স্কয়ার গ্রুপকে পথ দেখাচ্ছে। তাঁর যোগ্য উত্তরসূরিরা—তাঁর সন্তানেরা—একই সততা ও নিষ্ঠার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটিকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। আজ স্কয়ার গ্রুপ শুধু বাংলাদেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে তাদের পণ্য রপ্তানি করে দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনছে। স্যামসন এইচ চৌধুরীর জ্বালানো প্রদীপটি আজও স্বমহিমায় উজ্জ্বল।

উপসংহার: একজন স্যামসন এইচ চৌধুরী কেন চিরস্মরণীয়?

স্যামসন এইচ চৌধুরীর জীবন একটি অনুপ্রেরণার গল্প। এটি শূন্য থেকে শিখরে ওঠার গল্প, সততা দিয়ে সাফল্য অর্জনের গল্প এবং দেশের প্রতি ভালোবাসার গল্প। তিনি শুধু একটি সফল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তৈরি করেননি, তিনি একটি আস্থার প্রতীক তৈরি করেছেন। তাঁর জীবন থেকে শেখার আছে অনেক কিছু—বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের উদ্যোক্তাদের জন্য। তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে স্বপ্ন দেখতে হয়, কীভাবে সততার সঙ্গে ব্যবসা করতে হয় এবং কীভাবে দেশের মানুষের জন্য কাজ করতে হয়।

যতদিন বাংলাদেশে স্কয়ার গ্রুপ থাকবে, যতদিন সততা ও মানবিকতার চর্চা থাকবে, ততদিন স্যামসন এইচ চৌধুরী এদেশের মানুষের কাছে একজন কিংবদন্তী, একজন স্বপ্নদ্রষ্টা এবং একজন সত্যিকারের দেশপ্রেমিক হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। তিনি ছিলেন এক বটবৃক্ষ, যাঁর ছায়ায় বাংলাদেশের শিল্পায়ন পেয়েছে এক নতুন মাত্রা।

আহমেদ আকবর সোবহান ও বসুন্ধরা গ্রুপের উত্থানের গল্প

Leave a Comment

সম্পর্কিত পোস্টসমূহ

আপডেট পেতে সাবস্ক্রাইব করুন

Scroll to Top